“গাঁজা কোনো কড়া মাদক নয়”, “এটি প্রাকৃতিক, তাই এর কোনো ক্ষতিকর দিক নেই”, কিংবা “গাঁজা খেলে মনোযোগ বাড়ে”—আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন কিছু ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। বন্ধুদের আড্ডায় কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই অভ্যাসটি যে কত বড় মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয় ডেকে আমছে, তা শুরুতে টের পাওয়া যায় না। প্রকৃত সত্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা সেবনের ফলে মানবদেহে এবং বিশেষ করে মস্তিষ্কে এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যা একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষমতা কেড়ে নেয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, গাঁজা সেবনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি শুধু ফুসফুস বা লিভারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সরাসরি আঘাত করে মানুষের জিনিসপত্র, চিন্তা ভাবনা, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক ভারসাম্যের ওপর। আপনি যদি নিজে এই অভ্যাসের মধ্য দিয়ে যান কিংবা আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকেন, তবে এই ক্ষতিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। গাঁজা সেবনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সার্বিক চিত্র গাঁজা বা ক্যানাবিসের মূল সক্রিয় উপাদান হলো টিএইচসি (Tetrahydrocannabinol)। যখন কেউ নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন, তখন এই টিএইচসি শরীরের এন্ডোক্যানাবিনয়েড সিস্টেমের সাথে যুক্ত হয়ে পুরো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে তা স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, দীর্ঘস্থায়ী ক্যানাবিস ব্যবহার মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গাঁজা সেবনের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা হ্রাস গাঁজার ক্ষতিকর উপাদানগুলো মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) নামক অংশের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হিপোক্যাম্পাস মানুষের নতুন তথ্য জমা রাখা এবং স্মৃতিশক্তি নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। নিয়মিত গাঁজা সেবনের ফলে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি (Short-term memory) লোপ পায়। আক্রান্ত ব্যক্তি খুব দ্রুত কোনো জিনিস ভুলে যান এবং নতুন কোনো বিষয় বা পড়া সহজে মনে রাখতে পারেন না। মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা এবং মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। গাঁজা সেবনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হিসেবে এই অংশের কার্যকারিতা কমে যায়। এর ফলে একজন মানুষ জটিল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না এবং যেকোনো কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী প্রভাব মানব মস্তিষ্ক সাধারণত ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত বিকশিত হতে থাকে। এই বিকাশকালীন সময়ে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক বা সংযোগগুলো তৈরি হয়, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণ করে। কিশোর ও তরুণদের উচ্চ ঝুঁকি ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে যারা নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন, তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালে গাঁজা শুরু করলে মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ (Grey matter) কমে যায়, যা পরবর্তীতে স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি তৈরি করে। ডোপামিন সিস্টেম ও বুদ্ধিবৃত্তিক পতন গাঁজা কৃত্রিম উপায়ে মস্তিষ্কে ডোপামিন বা “ফিল গুড” হরমোনের বন্যা বইয়ে দেয়। দীর্ঘদিন এই কৃত্রিম উদ্দীপনা পাওয়ার কারণে মস্তিষ্ক নিজে থেকে স্বাভাবিক ডোপামিন তৈরি বন্ধ বা কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, স্বাভাবিক কোনো কিছুতেই আক্রান্ত ব্যক্তি আর আনন্দ পান না। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আইকিউ (IQ) লেভেল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদী গাঁজা সেবনে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় উদ্বেগ ও প্যানিক ডিসঅর্ডার অনেকে সাময়িক রিল্যাক্সেশনের জন্য গাঁজা সেবন করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি তীব্র এনজাইটি বা উদ্বেগের কারণ হয়। গাঁজা সেবনের কিছু সময় পর হঠাৎ করে বুক ধড়ফড় করা, দম আটকে আসা এবং মৃত্যুর ভয় তৈরি হওয়া—যাকে প্যানিক অ্যাটাক বলা হয়, তা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারকারীদের মধ্যে খুব সাধারণ। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা গাঁজা সেবনকারীদের মধ্যে ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন বা দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। জীবনের প্রতি চরম উদাসীনতা, কোনো কাজে উৎসাহ না পাওয়া এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে এই ক্যানাবিস আসক্তি সরাসরি দায়ী। ক্যানাবিস-ইনডিউসড সাইকোসিস এটি গাঁজা সেবনের অন্যতম ভয়ংকর রূপ। এর ফলে ব্যক্তি বাস্তবতার সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলেন। তিনি এমন কিছু শব্দ শোনেন বা এমন কিছু দেখেন যা বাস্তবে নেই (Hallucination)। এছাড়া তীব্র সন্দেহপ্রবণতা (Paranoia) তৈরি হয়, যেখানে তিনি মনে করেন সবাই তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। স্কিজোফ্রেনিয়া ও গুরুতর মানসিক রোগের ঝুঁকি যাদের পরিবারে আগে থেকেই মানসিক রোগের ইতিহাস রয়েছে, গাঁজা তাদের ক্ষেত্রে “ট্রিগার” হিসেবে কাজ করে। এটি জিনগতভাবে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো স্থায়ী ও নিরাময় অযোগ্য মানসিক ব্যাধিকে ত্বরান্বিত করে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন মানসিক পরিবর্তনের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বন্ধু, পরিবার এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। খিটখিটে মেজাজ, মিথ্যা বলার প্রবণতা এবং আবেগহীন আচরণ তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। গাঁজা আসক্তি কীভাবে তৈরি হয়: Cannabis Use Disorder (CUD) মানসিক নির্ভরশীলতার প্রক্রিয়া গাঁজা শারীরিক আসক্তির চেয়েও তীব্র মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরি করে। ব্যবহারকারী মনে করতে শুরু করেন যে গাঁজা ছাড়া তিনি ঘুমাতে পারবেন না, খেতে পারবেন না বা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারবেন না। এই মানসিক ফাঁদই হলো Cannabis Use Disorder (CUD)। সহনশীলতা (Tolerance) বৃদ্ধি ও ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা শুরুতে যে পরিমাণ গাঁজা সেবনে আনন্দ পাওয়া যেত, কিছুদিন পর মস্তিষ্ক তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে আগের মতো অনুভূতি পেতে ব্যবহারকারী ধীরে ধীরে গাঁজার পরিমাণ বা ডোজ বাড়াতে বাধ্য হন। আসক্তি অগ্রগতির ধাপসমূহ আসক্তি সাধারণত ৩টি ধাপে বাড়ে: ১. পরীক্ষামূলক (Experimental): বন্ধুদের চাপে বা কৌতূহলে প্রথমবার চেষ্টা। ২. নিয়মিত ব্যবহার (Regular Use): মানসিক চাপ কমাতে বা আনন্দের জন্য প্রায়ই সেবন。 ৩. অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি (Dependency): তীব্র ক্ষতি জানা সত্ত্বেও সেবন বন্ধ করতে না পারা। গাঁজা ছাড়ার পর Withdrawal প্রভাব যখন একজন দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারকারী হঠাৎ গাঁজা খাওয়া বন্ধ করেন, তখন তার শরীর ও মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যা উইথড্রয়াল সিম্পটম নামে পরিচিত। অনিদ্রা ও ঘুমের ব্যাঘাত গাঁজা ছাড়া রাতে কোনোভাবেই ঘুম না আসা, অদ্ভুত ও ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা। উদ্বেগ ও অস্থিরতা সারাক্ষণ হাত-পা কাঁপা, ভেতরে তীব্র অস্থিরতা এবং অস্থির চিত্ত হওয়া। খিটখিটে মেজাজ ছোটখাটো বিষয়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। এই লক্ষণগুলো থেকে বাঁচতেই অনেকে আবার মাদকের কাছে ফিরে যান। এই চক্র ভাঙতে পেশাদার Detoxification Treatment অত্যন্ত জরুরি। +—————————————————————–+ | গাঁজা আসক্তি চক্র (The Cannabis Addiction Cycle) | +—————————————————————–+ | ১. মানসিক চাপ বা কৌতূহল –> ২. গাঁজা সেবন (সাময়িক মুক্তি) | | | | | ৪. তীব্র উইথড্রয়াল লক্ষণ <– ৩. আসক্তি ও সহনশীলতা বৃদ্ধি | +—————————————————————–+ শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি গাঁজার ধোঁয়া ও টক্সিক উপাদান অনেকে মনে করেন সিগারেটের চেয়ে গাঁজা কম ক্ষতিকর। কিন্তু সাধারণ সিগারেটের ধোঁয়ায় যে পরিমাণ ক্ষতিকর টার (Tar) এবং কার্বন মনোক্সাইড থাকে, গাঁজার ধোঁয়ায় তার চেয়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি টক্সিক উপাদান
Blog
